বাংলাদেশে ডেঙ্গুকে আমরা দীর্ঘদিন ধরে বর্ষাকালের একটি মৌসুমি সমস্যা হিসেবে দেখে এসেছি। বৃষ্টি বাড়লে মশা বাড়বে, কয়েক মাস রোগীর সংখ্যা বাড়বে, এরপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে—আমাদের প্রচলিত প্রস্তুতিও যেন এই ধারণাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোর অভিজ্ঞতা এবং চলতি বছরের পরিস্থিতি সেই ধারণাকে নতুন করে পর্যালোচনা করার দাবি জানাচ্ছে।
১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, মাত্র ২৪ ঘণ্টায় দেশে ১,৪৮৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ইতোমধ্যে ৫৮ হাজার ছাড়িয়েছে এবং মৃত্যুর সংখ্যাও ১৭০-এর ঘর অতিক্রম করেছে।
এর আগের দিনও এক দিনে ১,৭৫৩ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এবং সাতজন মারা গেছেন।
সংখ্যাগুলো আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে—ডেঙ্গুকে আর কয়েক মাসের জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে মোকাবিলা করলে চলবে না।
এটি এখন নগর ব্যবস্থাপনা, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, আবাসন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক আচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত দীর্ঘমেয়াদি একটি সমস্যা।
প্রশ্ন হলো—আমাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থাও কি সেই বাস্তবতার সঙ্গে বদলেছে?
প্রতি বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে শুরু করলে আমরা প্রায় একই দৃশ্য দেখি। মশকনিধন অভিযান জোরদার হয়, বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালিত হয়, সচেতনতামূলক প্রচার বাড়ে এবং হাসপাতালগুলোতে প্রস্তুতি নেওয়া হয়।
এসব উদ্যোগ প্রয়োজনীয়। কিন্তু প্রকোপ শুরু হওয়ার পর জরুরি তৎপরতা দিয়ে একটি স্থায়ী জনস্বাস্থ্য সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
ডেঙ্গু প্রতিরোধের কার্যক্রমকে বছরের ১২ মাসের নগর ব্যবস্থাপনার অংশ করতে হবে।
এডিস মশার প্রজননস্থল শুধু বড় জলাশয় নয়। বাড়ির ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, ফেলে রাখা পাত্র, টায়ার, ফুলের টব, ভবনের বিভিন্ন অংশে জমে থাকা স্বচ্ছ পানি—এসব ছোট ছোট জায়গাও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ফলে একটি সিটি করপোরেশনের কয়েকটি মশকনিধন দল দিয়ে পুরো সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়।
প্রথম পরিবর্তন প্রয়োজন surveillance বা নজরদারি ব্যবস্থায়।
কোন এলাকায় ডেঙ্গু রোগী দ্রুত বাড়ছে, কোথায় এডিস মশার ঘনত্ব বেশি এবং কোন ধরনের স্থানে সবচেয়ে বেশি প্রজনন হচ্ছে—এসব তথ্য দ্রুত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে হবে।
Ward-level data ব্যবহার করে আগাম ঝুঁকির মানচিত্র তৈরি করা গেলে প্রকোপ বড় হওয়ার আগেই লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
প্রযুক্তি এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
হাসপাতালের রোগীর তথ্য, সিটি করপোরেশনের মশা জরিপ, আবহাওয়া, বৃষ্টিপাত এবং নাগরিক অভিযোগের তথ্য সমন্বয় করে একটি real-time dengue monitoring system গড়ে তোলার সময় এসেছে।
দ্বিতীয়ত, শুধু মশা মারার পরিবর্তে প্রজননস্থল ধ্বংসকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
ফগিং দৃশ্যমান একটি কার্যক্রম হলেও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের পুরো সমাধান ফগিং নয়। বাড়ি, ভবন, নির্মাণ প্রকল্প, বাজার এবং সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায় নিয়মিত উৎস নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
নির্মাণাধীন ভবন বিশেষ নজরদারিতে রাখা দরকার।
নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ও ভবন মালিকদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। নির্দিষ্ট জায়গায় বারবার এডিসের লার্ভা পাওয়া গেলে শুধু সাময়িক অভিযান নয়, নিয়ম অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, নাগরিক অংশগ্রহণ ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
সরকার বা সিটি করপোরেশন রাস্তাঘাট পরিষ্কার করতে পারে, কিন্তু প্রতিটি বাড়ির ছাদ, বারান্দা বা ব্যক্তিগত জমিতে গিয়ে প্রতিদিন জমে থাকা পানি পরীক্ষা করা কোনো কর্তৃপক্ষের পক্ষেই সম্ভব নয়।
প্রতিটি পরিবারকে সপ্তাহে অন্তত একবার নিজের বাড়ি ও আশপাশে সম্ভাব্য প্রজননস্থল পরীক্ষা করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
স্কুল, কলেজ, মসজিদ, অফিস, মার্কেট এবং আবাসিক সমিতিগুলোকেও এই ব্যবস্থার অংশ করা যায়।
চতুর্থত, হাসপাতাল প্রস্তুতিকে শুধু শয্যার সংখ্যায় সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না।
ডেঙ্গু রোগীর দ্রুত diagnosis, triage, পর্যাপ্ত fluid management, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং জটিল রোগীর দ্রুত referral নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা শক্তিশালী করা প্রয়োজন, যাতে প্রত্যেক রোগীকে চিকিৎসার জন্য রাজধানীতে আসতে না হয়।
ডেঙ্গু চিকিৎসা নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্যও একটি সমস্যা। সরকারি স্বাস্থ্য নির্দেশনা নাগরিকদের কাছে সহজ ভাষায় নিয়মিত পৌঁছে দিতে হবে—কোন লক্ষণে পরীক্ষা প্রয়োজন, কখন হাসপাতালে যেতে হবে এবং কোন লক্ষণগুলো বিপদের সংকেত তা পরিষ্কারভাবে জানানো দরকার।
পঞ্চমত, এক প্রতিষ্ঠানের ওপর সম্পূর্ণ দায় চাপিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নির্মাণ কর্তৃপক্ষ এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
দায়িত্ব কার—এই বিতর্কে সময় নষ্ট করার চেয়ে দায়িত্ব ভাগ করে measurable target নির্ধারণ করা বেশি কার্যকর।
কোন ওয়ার্ডে কতগুলো সম্ভাব্য প্রজননস্থল শনাক্ত হলো, কতগুলো নির্মাণাধীন ভবন পরিদর্শন করা হলো, কোথায় রোগীর সংখ্যা বাড়ছে—এসব তথ্য নিয়মিত জনসমক্ষে প্রকাশ করা যেতে পারে।
স্বচ্ছতা কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির মধ্যে রাখবে এবং নাগরিককেও নিজের এলাকার পরিস্থিতি বুঝতে সাহায্য করবে।
আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
ডেঙ্গু এখন শুধু ঢাকার সমস্যা নয়।
সাম্প্রতিক তথ্য বিভিন্ন বিভাগ ও সিটি করপোরেশনে রোগী শনাক্ত হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করছে। ফলে ঢাকাকেন্দ্রিক কৌশলের পরিবর্তে দেশব্যাপী স্থানীয় পরিস্থিতির সঙ্গে মানানসই প্রতিরোধ ব্যবস্থা প্রয়োজন।
আমাদের স্বীকার করতে হবে—ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহের পরিচ্ছন্নতা অভিযান নয়।
এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা।
বর্ষা আসার পর মশা মারার অভিযান শুরু করার পরিবর্তে শুষ্ক মৌসুম থেকেই surveillance, নগর পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নির্মাণস্থল পরিদর্শন এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম চালু রাখা প্রয়োজন।
প্রতিরোধ ব্যবস্থায় বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তি, স্থানীয় তথ্য এবং নাগরিক অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রতিবছর একই সংকটের পর একই ধরনের জরুরি ব্যবস্থা নিয়ে আমরা যদি পরের বছরের জন্য অপেক্ষা করি, তাহলে পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন হবে না।
সময় এসেছে প্রশ্নটি নতুনভাবে করার।
“এই বছর ডেঙ্গু কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করব”—শুধু এটুকু নয়।
বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—
“বাংলাদেশকে কীভাবে এমন একটি স্থায়ী ডেঙ্গু প্রতিরোধ ব্যবস্থা দিতে পারি, যা বছরের ১২ মাস কার্যকর থাকবে?”
ডেঙ্গু যদি আর শুধু মৌসুমি সংকট না থাকে, তাহলে আমাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থাও আর মৌসুমি থাকতে পারে না।
এখন প্রয়োজন প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আগাম, তথ্যভিত্তিক এবং সমন্বিত প্রতিরোধ ব্যবস্থায় যাওয়া।
মানুষের জীবন রক্ষার জন্য এই পরিবর্তন আর বিলম্বিত করার সুযোগ নেই।
মোঃ হুমায়ুন কবির ব্যবস্থাপনা সম্পাদক Deshpotro.com
