দেশের উপজেলা কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতি (ইউসিসিএ) এবং গ্রামপর্যায়ের প্রাথমিক কৃষক সমবায় সমিতিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা, সুশাসন এবং ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতা, আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং সমবায় ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে সমন্বিত সংস্কার উদ্যোগের দাবি তুলেছেন সমবায় নেতৃত্ব ও অংশীজনেরা।
বাংলাদেশে দ্বি-স্তর সমবায় কাঠামোর ঐতিহাসিক সূচনা হয়েছিল ষাটের দশকে কুমিল্লায় বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (বার্ড) প্রতিষ্ঠাতা ড. আখতার হামিদ খানের হাত ধরে, যা সমবায় ইতিহাসে বিখ্যাত ‘কুমিল্লা মডেল’ নামে পরিচিত। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর দেশ পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে ১৯৭২ সালে সমন্বিত পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচি (আইআরডিপি)-র আওতায় এই মডেল সারাদেশে সম্প্রসারিত হয়। কৃষকদের সংগঠিত করা, ক্ষুদ্র সঞ্চয় ও নিজস্ব পুঁজি গঠন, সহজে কৃষিঋণ প্রাপ্তি, সেচ সুবিধা, আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি সরবরাহ এবং শেষ পর্যন্ত গ্রামীণ অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের লক্ষ্যে গ্রামপর্যায়ে কৃষক সমবায় সমিতি (কেএসএস) এবং উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতি (ইউসিসিএ) গড়ে তোলা হয়েছিল।
বিগত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের জনসংখ্যা এবং কৃষির অর্থনৈতিক পরিধি বহুগুণ বেড়েছে। উৎপাদনশীলতায় এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন, বিকাশ ঘটেছে আধুনিক বিপণন ও এগ্রো-প্রসেসিং শিল্পের। তবে এই অগ্রগতির বিপরীতে তৃণমূলের বিপুলসংখ্যক প্রাথমিক কৃষক সমবায় সমিতি বর্তমানে নিষ্ক্রিয় বা সাংগঠনিকভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
একসময় মাঠপর্যায়ে কৃষি উৎপাদন ও কৃষক সংগঠনে যে জোরালো ভূমিকা সমবায়গুলোর ছিল, তা সময়ের সঙ্গে সংকুচিত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে উপজেলা পর্যায়ের কেন্দ্রীয় সমিতিগুলোতেও। সারাদেশের বহু ইউসিসিএ এখন চরম রাজস্ব সংকট ও পরিচালন ব্যয়ের টানাপোড়েনে ভুগছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন-ভাতা প্রদান কিংবা অবসরকালীন গ্র্যাচুইটি পরিশোধ নিয়ে দীর্ঘদিনের জটিলতা তৈরি হয়েছে।
সমবায় খাতের প্রাতিষ্ঠানিক পর্যালোচনা বিশ্লেষণে দুটি ভিন্ন আইনি কাঠামোর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। সমবায় সমিতি আইন, ২০০১ (সংশোধিত ২০০২ ও ২০১৩)-এর বিধান অনুযায়ী সমবায় সমিতি একটি স্বশাসিত নিবন্ধিত সত্তা। আইনের আওতায় প্রত্যেকটি সমিতির পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নির্বাচিত বা মনোনীত ব্যবস্থাপনা কমিটির ওপর ন্যস্ত থাকে, যা সমিতির নিবন্ধিত উপ-আইন দ্বারা পরিচালিত হয়।
অন্যদিকে, মাঠপর্যায়ে সমবায় কার্যক্রমে প্রযুক্তি ও ঋণ সহায়তার অন্যতম অংশীদার বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি) পরিচালিত হচ্ছে ‘বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড আইন, ২০১৮’-এর অধীনে (পূর্বতন ১৯৮২ সালের অধ্যাদেশ রহিত করে প্রণীত)। সমবায় সংশ্লিষ্টদের মতে, সমবায় আইনে গঠিত একটি স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের সম্পদ, তহবিল ও কার্যক্রমে সরকারি উন্নয়ন সংস্থার মাঠপর্যায়ের ভূমিকা ও প্রশাসনিক সীমারেখা আরও সুস্পষ্ট ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সমন্বিত হওয়া প্রয়োজন। স্বায়ত্তশাসন অক্ষুণ্ণ রেখে কীভাবে উন্নয়ন অংশীদারত্ব বজায় রাখা যায়, সে বিষয়েও দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালার তাগিদ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউসিসিএ ও কৃষক সমবায়গুলোর বর্তমান আর্থিক সংকটের বড় কারণ কেবল ঋণ বিতরণ ও আদায়ের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল থাকা। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে সমবায়গুলোকে টিকিয়ে রাখতে হলে কেবল অর্থায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বহুমুখী সেবা কার্যক্রম চালু করা প্রয়োজন।
এর মধ্যে রয়েছে সরাসরি কৃষিপণ্য সংগ্রহ ও পাইকারি বাজারজাতকরণ, ন্যায্যমূল্যের কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগার নেটওয়ার্ক স্থাপন, আধুনিক শস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং প্রান্তিক চাষিদের জন্য সুলভ মূল্যে কৃষিযন্ত্র সেবা কেন্দ্র চালু করা। সমবায়ের মাধ্যমে সরাসরি বাজার ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হতে পারলে একদিকে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব হ্রাস পাবে, অন্যদিকে সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব আয় ও তহবিল সমৃদ্ধ হবে।
সমবায়ের মূল চালিকাশক্তি হলেন প্রান্তিক কৃষকেরা। তাই প্রাথমিক সমবায়গুলোতে নতুন প্রজন্মের কৃষক ও তরুণ উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করতে আধুনিকায়ন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে পরিবেশবান্ধব কৃষিতে সৌরবিদ্যুৎ চালিত সেচ ব্যবস্থার বিস্তার ঘটছে এবং ড্রোন ও আইওটি ভিত্তিক নির্ভুল সেচ প্রযুক্তির ব্যবহারে পানির অপচয় কমছে। এছাড়া অনুকূল পরিবেশ ও আধুনিক ব্যবস্থাপনায় বোরো মৌসুমে বাম্পার ফলন ও রেকর্ড উৎপাদন অর্জিত হচ্ছে। এই আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃষি সেবার সঙ্গে সমবায় কাঠামোর প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ তৈরি করা গেলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে একক কৃষকভিত্তিক ক্ষুদ্রঋণ ও কৃষি উদ্যোক্তা অর্থায়নের সুযোগ সমবায়ের মাধ্যমে সম্প্রসারণের তাগিদ রয়েছে।
কৃষি সমবায়গুলোর সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ সরকারি পর্যায়েও স্বীকৃত ও পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে। সমবায় অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, সমবায় খাতের টেকসই উন্নয়নে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ‘সমবায় সমিতিসমূহের উন্নয়নে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জসমূহ চিহ্নিতকরণ ও সমাধানের কৌশল নির্ধারণ: প্রেক্ষিত কৃষি সমবায় সমিতি’ শীর্ষক একটি প্রায়োগিক গবেষণার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এ লক্ষ্যে গবেষণা দল কাজ করছে। সরকারি এই উদ্যোগ থেকে তৃণমূলের সমবায়গুলোর বাস্তব সমস্যা ও সমাধানের দিকনির্দেশনা উঠে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইউসিসিএ ও কৃষক সমবায়ের সংকট নিরসনে সম্প্রতি নীতি-নির্ধারণী মহলে লিখিত প্রস্তাবনা ও আলোচনা তুলে ধরা হয়েছে। সাপ্তাহিক সময়ের প্রয়াস-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে বাংলাদেশ জাতীয় পল্লী উন্নয়ন সমবায় ফেডারেশনের সভাপতি এইচ এম হাসান আল মামুন (লিমন) স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন।
ফেডারেশন সভাপতির প্রস্তাব অনুযায়ী, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ, বিআরডিবি, সমবায় অধিদপ্তর, ইউসিসিএ নেতৃত্ব, সমবায়ী প্রতিনিধি, কৃষি অর্থনীতিবিদ ও গবেষকদের সমন্বয়ে এই বিশেষ কমিটি গঠন করা যেতে পারে। তাঁর দাবি, এই কমিটি মাঠপর্যায়ে গিয়ে ইউসিসিএগুলোর আর্থিক স্থবিরতা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন সমস্যা এবং প্রাথমিক সমিতির পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনা করে একটি কার্যকর উত্তরণের পথ নির্ধারণ করবে।
সমবায় বিশ্লেষকদের মতে, কৃষক সমবায় কোনো কাগুজে প্রতিষ্ঠান নয়; এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও কোটি কৃষকের জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জাতীয় সামাজিক-অর্থনৈতিক শক্তি। আইনগত স্পষ্টতা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা, আর্থিক বহুমুখীকরণ এবং সময়োপযোগী সংস্কারের মাধ্যমেই কেবল কৃষক সমবায় আন্দোলনকে আবারও স্বাবলম্বী ও কার্যকর শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব।
